ভোরবেলা রাস্তাটা যেন এক নীরব প্রতিশ্রুতি ছিল।
মায়া শেষবারের মতো মানচিত্রগুলো গ্লাভ বক্সে ঢুকিয়ে নিল। পুরোনো গাড়িটা কেশে উঠল, যেন ঘুম ভেঙে উঠছে। কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই সফর—সে জানত না। শুধু জানত, শুরু করতেই হবে। এক থার্মস কফি, আধা-চার্জ ফোন আর পুরোনো প্রিয় গানের প্লেলিস্ট নিয়ে সে হাইওয়েতে উঠে পড়ল। আকাশটা তখন হালকা গোলাপি।
প্রথম কয়েক ঘণ্টা ছিল সহজ। রোদের আলো মাঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ছিল। ছোট ছোট শহরগুলো পোস্টকার্ডের মতো ভেসে যাচ্ছিল—একটা বেকারি খুলছে, বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলে হাত নাড়ছে, গ্যাস স্টেশনের ছায়ায় ঘুমানো একটা কুকুর। তৃতীয় কাপ কফির পরেই হঠাৎ জিপিএস বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক তখনই আকাশ কালো করে ঝড় নামল।
মায়া একটা এক্সিট নিল, যেখানে হাত দিয়ে লেখা সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—
“সিনিক রুট—ভরসা রাখুন।”
রাস্তাটা সরু হয়ে পাহাড়ের দিকে বেঁকে গেল। বৃষ্টি কাঁচে টাপটাপ পড়ছে। হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিন থেমে গেল। মায়া হেসে ফেলল—কারণ এমন সময় না হাসলে আর কখন হাসবে? পাহাড়ের ধারে একটা ভিউপয়েন্টের কাছে গাড়িটা থামল। বৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝিরঝিরে হয়ে এলো।
ঠিক তখনই পেছনে একটা পিকআপ গাড়ি থামল। ভেতর থেকে নামা নারীটির মুখে বাতাসে পোড়া ছাপ, আর চোখে এমন হাসি—যেন সে রাস্তাতেই বড় হয়েছে।
“গাড়িটা গরম হয়ে গেছে,” সে বলল, বনেটের ওপর হাত বুলিয়ে।
দু’জনে মিলে পানি ঢেলে, একটু অপেক্ষা করে ইঞ্জিনটাকে শান্ত করল। কৃতজ্ঞতায় মায়া তার কফি ভাগ করে নিল। বদলে পেল এমন কিছু দিকনির্দেশ, যা কোনো মানচিত্রে নেই।
“নদীর পথ ধরো,” নারীটি বলল। “পৌঁছে গেলে নিজেই বুঝবে।”
নদীর পাশের রাস্তাটা ছিল জাদুর মতো। পাথরের সেতু, বনভরা পাহাড়, ঝরনার শব্দ—সব মিলিয়ে এক স্বপ্ন। একটা ছোট শহর পেরিয়ে গেল, যেখানে পাইন গাছ আর গরম রুটির গন্ধ। এক বাঁকে হঠাৎ গাছ সরে গিয়ে দেখা দিল বিশাল উপত্যকা। মেঘ ফাঁক করে রোদ পড়ছে, যেন আশীর্বাদ।
মায়া গাড়ি থামিয়ে নদীর ধারে হাঁটল। নদীর শব্দে যেন ভয় আর দুশ্চিন্তা সব ভেসে গেল। সে পাথর ছুঁড়ল পানিতে—একটার পর একটা—যতক্ষণ না হাত ব্যথা আর মন শান্ত হলো।
রাতে সে একটা ক্যাম্পসাইট পেল। শুকনো ডাল দিয়ে আগুন জ্বালাল। নুডলস রান্না করল আর আকাশে একে একে তারারা জ্বলে উঠতে দেখল—এত পরিষ্কার আকাশ সে আগে দেখেনি। নীরবতাটা ছিল সম্পূর্ণ, আর ভীষণ আপন।
পরদিন সকালে গাড়ি একবারেই স্টার্ট নিল। মায়া আবার রাস্তায় নামল। কোনো তাড়া নেই, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই—শুধু চলার ইচ্ছা। কারণ এই পথ তাকে শিখিয়েছে একটাই কথা:
গন্তব্যের চেয়ে এগিয়ে চলাটাই বড়, বিশেষ করে যখন মানচিত্র শেষ হয়ে যায়।
আর রাস্তা—অন্তহীন, ধৈর্যশীল—তার চাকার অপেক্ষায় রইল।

No comments:
Post a Comment